চাকরির চেয়ে ব্যবসা যে ১০ কারণে সেরা!

চাকরির চেয়ে ব্যবসা যে ১০ কারণে সেরা!

-হাবিবুন নাহার মিমি

চাকর+ই=চাকরি, অর্থাৎ চাকরির অপর নাম চাকরগিরি করা। শুনতে ভালো শোনায় না বলেই হয়তো আজকাল চাকরির পরিবর্তে মানুষ "জব" শব্দটাই বেশি ব্যবহার করে। জব বা চাকরি, নাম যেটাই হোক, এটা আসলে এমন একটা পেশা যাতে আপনাকে অন্য কারো অধীনে থেকে তার উন্নতির জন্য তার চাহিদামাফিক কাজ করে যেতে হয়, যার বিনিময়ে মাস শেষে আপনাকে বেতন দেওয়া হয়। বাসার কাজের বুয়া থেকে শুরু করে সরকারি চাকরিসহ সব ধরণের চাকরিকেই এই সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করা যায়।
আর ব্যবসা? ব্যবসা হলো আপনার নিজের উদ্যোগকে বাস্তবায়িত করার জন্য নিজের মতো করে কারো অধীনে না থেকে নিজে কাজ করা এবং অন্যদেরকে দিয়ে কাজ করানো। অর্থাৎ, একজন ব্যবসায়ীর অধীনে চাকরিজীবীরা কাজ করে।




আপনি যদি একটা ব্যাংকে চাকরি করেন তাহলে এই ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা যিনি তিনি একজন ব্যবসায়ী, আপনি তার অধীনে চাকরি করেন। আপনি যদি একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করেন তাহলে সেই কোম্পানির ওনার বা চেয়ারম্যান একজন ব্যবসায়ী আর আপনি তার আন্ডারে থাকা একজন চাকরিজীবী। সংজ্ঞা থেকেই বোঝা যাচ্ছে ব্যবসা চাকরির চেয়ে উঁচু অবস্থানে থাকে সবসময়। তবে মনে রাখতে হবে, উঁচুতে উঠতে হলে আপনাকে অবশ্যই সেটার যোগ্য হতে হবে। সেটা হোক পরিশ্রম, কর্মদক্ষতা, অধ্যবসায় বা যেকোনোভাবে।
নিচে এমন ১০টি কারণ দেখানো হলো যেসব কারণে ব্যবসা চাকরির চেয়ে সেরা:
১. ব্যবসা করা সুন্নাহ: আপনি যদি একজন মুসলিম হন, তাহলে আপনার জন্য এটা জানাই যথেষ্ট যে ব্যবসা করা সুন্নাহ। আমাদের প্রিয়নবী রাসূলে আকরাম (সা) নিজে ব্যবসায়ী ছিলেন। শুধু তিনি নন, দাউদ (আ)সহ বিভিন্ন নবী রাসূলগণ, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈ, তাবে-তাবেঈদের অধিকাংশই পেশা হিসেবে ব্যবসাকে বেছে নিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সরাসরি কুরআনের আয়াতে ব্যবসা হালাল হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার মাধ্যমে ব্যবসা করতে উৎসাহ প্রদান করেছেন।
২. কাজের স্বাধীনতা: ব্যবসায় আপনি নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকেন এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারেন। চাকরির মতো ব্যবসায় আপনি কারো হুকুমের গোলাম নন, কেউ কথায় কথায় আপনার উপর ছড়ি ঘোরাবে না, বসের মনোরঞ্জনের জন্য সর্বদা আপনার চিন্তিত থাকতে হবে না, কারো কথায় উঠতে বসতে হবে না। ব্যবসায় আপনিই রাজা, আপনার অধীনে যারা চাকরি করবে তারা আপনার নির্দেশে চলবে, কিন্তু আপনি কারো নির্দেশের অধীনে থাকবেন না।
৩. আর্থিক স্বাধীনতা: চাকরিতে যেখানে আপনি একটি নির্দিষ্ট বেতনে আপনাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয় বছরের পর বছর এবং বেতন বাড়ানোর জন্য উপরওয়ালার পা-চাটা তথা মোসাহেবি ছাড়া খুব একটা উপায় থাকে না, সেখানে ব্যবসা করে আপনি অনেক বেশি টাকা উপার্জন করতে পারেন। আপনি কতটা উপার্জন করবেন সেটা আপনার উপরই নির্ভর করবে। কম পরিশ্রম করলে কম উপার্জন করবেন, বেশি পরিশ্রম করলে বেশি উপার্জন করবেন। যেকোনো সময় হুট করে চাকরি চলে গিয়ে পথে বসার ভয়ও থাকবে না।
৪. স্বপ্নপূরণ: ব্যবসা করে আপনি নিজের স্বপ্নগুলি পূরণ করতে পারেন। আপনি নিজেকে মিলিয়নিয়ার, বিলিয়নিয়ার, স্বনামধন্য উদ্যোক্তা ইত্যাদি যেকোনো পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেন। মনে রাখবেন, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধনীই বলুন বা সফল মানুষই বলুন, তারা কেউই কিন্তু চাকরিজীবী নন, তারা ব্যবসায়ী। তাদের অধীনে লাখ লাখ লোকজন চাকরি করে।
৫. স্বপ্নের কাজ: ব্যবসা করে আপনি নিজের পছন্দের কাজ করতে পারেন। চাকরিতে আপনি প্রতিদিন নির্দিষ্ট কাজ করতে হয় এবং প্রতিদিনই একঘেয়ে বাঁধাধরা রুটিনমাফিক কাজ করে যেতে যেতে কাজের প্রতি বিতৃষ্ণা চলে আসে। কিন্তু ব্যবসার সাথে সাথে আপনি নিজের পছন্দের কাজও করতে পারেন। আর ব্যবসা যদি হয় পছন্দের কাজকে ঘিরে, তাহলে তো কথাই নেই। নিজের মনের মতো কাজ নিয়ে এগিয়ে যেতে পারেন বহুদূর, সফলতার জন্য এটি একটি বিশাল টেকনিক।
৬. সময়ের নিয়ন্ত্রণ: ব্যবসা করে আপনি নিজের সময় নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। আপনি নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সময়কে ব্যবহার করতে পারেন। এতে আপনাকে চাকরির মতো আটটা-পাঁচটা ডেস্কে বসে থাকতে হবে না। বরং আপনার সুবিধা আর কাজের ডিমান্ড অনুযায়ী আপনি সময়কে ভাগ করে নিতে পারবেন।
৭. নতুন কিছু শিখতে পারেন: ব্যবসা করে আপনি নতুন কিছু শিখতে পারেন। ব্যবসায় আপনি সব সময় নতুন স্কিল এবং জ্ঞান অর্জন করতে পারেন। সিনিয়র ব্যবসায়ীদের থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন, নতুন নতুন কমিউনিকেশন স্কিল ডেভেলপমেন্ট করতে পারেন, কানেকশন তৈরি করতে পারেন।
৮. সম্পর্ক: ব্যবসা করে আপনি নিজের সম্পর্ক উন্নয়ন করতে পারেন। ব্যবসায় প্রতিদিন আপনি নতুন নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হবেন। তাদের চিন্তাধারা, অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে পারবেন। একেক ধরণের মানুষকে একেলভবে হ্যান্ডেল করা শিখতে পারবেন।
৯. নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা: ব্যবসা করে আপনি নিজের একটি ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করতে পারেন এবং আপনার নিজের পরিচয় নিজেই তৈরি করতে পারেন। আপনি নিজেকে সম্মানিত করতে পারেন এবং আদর্শমূলক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পারেন। তখন অমুক জায়গায় চাকরি করি বলার পরিবর্তে মানুষ আপনাকে দিয়েই আপনার প্রতিষ্ঠানকে চিনবে, প্রতিষ্ঠানের নামে আপনাকে নয়।
১০. সৎ ব্যবসায়ীর পুরস্কার জান্নাত: ব্যবসা যখন আমানতদারিতা, বিশ্বস্ততা ও সততার সঙ্গে করা হবে, তখন এটি নেক আমলে পরিণত হবে। যারা সততা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করেন, তাঁরা যেমন মানুষের কাছে সম্মানিত, তেমনি আল্লাহর কাছেও মর্যাদাবান। এ প্রসঙ্গে বেশ কিছু হাদিস রয়েছে। হাদিস শরিফে এসেছে,
‘সৎ ও আমানতদার ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সত্যবাদী ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস ১২০৯)
মহানবী (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা ওই ব্যক্তির ওপর রহম করুন, যিনি বেচাকেনা ও ঋণ পরিশোধে উদারতা অবলম্বন করেন।’ (বুখারি)
তিনি আরও বলেন, ‘আল্লাহ ওই ব্যবসায়ীকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যিনি বেচাকেনায় সহজতা অবলম্বন করেন।’ (ইবন মাজাহ)
এই উল্লেখিত কারণগুলো ছাড়াও আরো হাজারও কারণে ব্যবসা শ্রেষ্ঠ। তবে, ব্যবসা করার ক্ষেত্রে আপনার প্রচুর পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতি প্রয়োজন। একটি ভাল ব্যবসার জন্য কঠোর পরিকল্পনা, জ্ঞান, অধ্যবসায় এবং সাংগঠনিক ক্ষমতা থাকতে হয়। থাকতে হয় ঝুঁকি নেওয়ার সামর্থ্য ও সাহস। থাকতে হয় দূরদর্শিতা ও ম্যানেজমেন্ট এ পারদর্শিতা। এসব ছাড়া যে কেউ চাইলেই ব্যবসায়ী হয়ে যেতে পারে না।

No comments

Theme images by Storman. Powered by Blogger.