দাইয়্যুস; এক অসহায় বাবার হৃদয় ভাঙার গল্প
গল্প: দাইয়্যুস
- হাবিবুন নাহার মিমি
- ইমাম সাব, আইন্নের লগে ইট্টু কতা আছিন।
এশার নামাজ শেষ করে মসজিদ থেকে বের হওয়ার জন্য পা বাড়াতেই ইমাম মোবারক আলী সাহেবকে পেছন থেকে ডাকলেন এক মুসল্লি।
- কেমন আছো আব্দুর রহমান?
- আলহামদুলিল্লাহ হুজুর, আইন্নে কিরম আছুইন?
- আলহামদুলিল্লাহ ভাই। কি যেন বলতে চাইলে?
- হুজুর আমার বড় মাইয়াডা এইবার ঢাকা ভার্সিডিত চান্স পাইছে। আমি তো লেহাপড়ার কিছুই বুঝিনা, কোন সাবজেক্টে ভর্তি করামু আইন্নের লগে পরামর্শ করবার চাই। আইন্নের মাইয়াও তো হেই ভার্সিডিত-ই পড়ে।
- আব্দুর রহমান, ভার্সিটি কিন্তু আল্লাহর একটা বড় পরীক্ষার জায়গা। স্বাধীনতা পেয়ে ছেলেমেয়েরা বিপথে চলে যেতে পারে, আবার দ্বীনদার ভালো মানুষদের সাথে মিশে সুপথেও আসতে পারে।
তার আগে তুমি বলো, তুমি কি দাইয়্যুস হিসেবে জাহান্নামে যেতে চাও? নাকি জান্নাতের মহা নিয়ামতে থাকতে চাও?
- আস্তাগফিরুল্লাহ! কি কন হুজুর? দাইয়্যুস কি কেউ হইতে চায়? সবাই তো চায় পোলা মাইয়া তাগর জান্নাতের যাওনের উসিলা হোক।
- হ্যাঁ ভাই। তুমি যদি চাও তোমার মেয়ে ভার্সিটিতে পর্দার সাথে দ্বীন মানে লেখাপড়া করুক, তাহলে এমন সাবজেক্টে ভর্তি করাও যেখানে দ্বীনী পরিবেশ আছে, ছেলেমেয়েরা ইচ্ছামতো চলাফেরা করতে পারে না, স্যাররা সচ্চরিত্র আর যে সাবজেক্টে পড়ে সে দ্বীন শিখতে পারবে।
- এইরম সাবজেক্ট ভার্সিডিত আছে হুজুর?
- হ্যা, তবে খুব কম। তুমি তোমার মেয়েকে ইসলামিক স্টাডিজ বা আরবি সাবজেক্টে ভর্তি করাও। মেয়ে আল্লাহর কালাম শিখবে। সারাদিন কোরআন হাদিসের মধ্যে থাকলে ফিতনায় পড়ার সম্ভাবনা কম।
- হুজুর আরেকটা উপকার করেন, আমি তো কুনোদিন ঢাকা শহর দেখি নাই, ভর্তি করাইতে আইন্নে ইট্টু আমার লগে যাবাইন?
- ইনশাআল্লাহ ভাই। আমার মেয়েটাকেও অনেক দিন দেখিনা। দেখে আসা যাবে।
সেদিন রাতে মেয়ের সাথে ফোনে কথা বলে প্রশান্তি নিয়ে ঘুমাতে গেলেন মোবারক আলী সাহেব। আলহামদুলিল্লাহ তার মেয়ে ছোটবেলা থেকেই পর্দা কর। বাবা মায়ের খুব বাধ্য মেয়ে। মোবারক আলী সাহেব তার একমাত্র মেয়েকে উসিলা করে জান্নাতে যেতে চান। মসজিদে খুতবায় কন্যার বাবাদের বলেন মেয়েকে পর্দায় রাখতে। মেয়ে যদি বেপর্দা চলাফেরা করে তাহলে সেই বাবাকে আল্লাহ কিয়ামতের দিন দাইয়্যুস হিসেবে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করবেন। তিনি নিজেকে সুখী ভাবেন। যখন তার মেয়ে বাড়িতে আসে, পর্দাবৃত জান্নাতের উসিলাকে দেখে তিনি আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানান।
দুইদিন পর—
আলম এশিয়া বাসের সিটে ধপ করে বসে পড়লেন মোবারক আলী সাহেব। জীবনটা আজ তার কাছে অর্থহীন মনে হচ্ছে। জীবনযুদ্ধে পরাজিত সৈনিকের মতো তার চোখে চিকচিক করছে হেরে যাওয়ার অশ্রু। তিনি আজ বড় ক্লান্ত, বিধ্বস্ত।
এমন সময় ইমাম সাহেবের ফোনের রিংটোন বেজে উঠলো। একবার, দুইবার...
রিং হয়ে কল কেটে যাচ্ছে। মোবারক আলী সাহেবের জন্য কোন হুশই নেই। ইতস্তত করে পাশ থেকে সেই মুসল্লি তাকে স্পর্শ করে একটু নাড়া দিলেন ঘর থেকে যেন জেগে উঠলেন তিনি ধীরে ধীরে মোবাইল বের করে ফোনের স্ক্রিনে নামটা দেখে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না। চোখ থেকে দু’ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো।
- "আব্বা তুমি নাকি ঢাকা আসছো? বাড়িতে ফোন দিছিলাম, আম্মা কইলো। কারে নাকি ভার্সিটিতে ভর্তি করাব? তুমি ঢাকায় আসতেছ আমারে জানাবা না? এখন কোথায় আছো বলো, আমি আসতেছি।"
- "আমি চলে আসছি মা। আরেকদিন দেখা করবো।" ধরা গলায় কোনরকমে উচ্চারণ করলেন মোবারক সাহেব।
- চলে গেছো মানে? তুমি এখানে আসলে জানালে না, আবার এখন দেখা না করেই চলে যাচ্ছ? কোথায় আছো বলোতো আমাকে আমি এখনই আসতেছি।
- আর শুনে লাভ নেই মা। বড় আশা করে ভার্সিটিতে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে ভর্তি করাইছিলাম তোরে। তোরে আমি জান্নাতে যাওয়ার উসিলা ভাবতাম। ভার্সিটির কোরআন হাদিস নিয়ে পড়লে তুই দ্বীনের মধ্যে থাকবি, পর্দা করবি। বড় আশা ছিল মাগো, আল্লাহর হাশরের ময়দানে বলব, "আমি তোমার আমানতকে পবিত্র রাখছি আল্লাহ, তোমার পথে চালাইছি, এখন তুমি তোমার ওয়াদা পূর্ণ করো। আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাও।"
কিন্তু তুই তো আমার আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর মুখ রাখলি না। আমারে তুই দাইয়্যুস বানিয়ে দিলি মা, দাইয়্যুস বানিয়ে দিলি।"
বলতে বলতে শিশুর মত কান্নায় ভেঙে পড়লেন মোবারক সাহেব। ফোন কেটে গেল। ফোনের ওপারে বিমুঢ় হয়ে বসে আছে মোবারক সাহেবের মেয়ে। তার বাবা এসব কি বললো! বাবার নম্বরে আবার ডায়াল করলো সে। ফোন রিসিভ করছে না বাবা।
অনেকবার রিং হওয়ার পর রিসিভ হলো। কানে ঠেকানোর সাথে সাথে অনেক হৈচৈ এর শব্দ শুনতে পেলো। যে ফোন রিসিভ করেছে সে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
"আম্মা গো, আইন্নের আব্বা আর নাই গো আম্মা! আইন্নের লগে কথা কইয়া কানতে কানতে চুপ হইয়া গেছেন। হাত দিয়া দেখি নিঃশ্বাস চলে না। এইডা আইন্নে কি করলাইন গো মা! যে মানুষটার জীবনে এক ওয়াক্ত নামাজেও জামাত ছুটে নাই, কোন সুন্নত তরক করেন নাই, ওই মানুষটারে আইন্নে দাইয়্যুস বানাইয়া কবরে পাঠাইলেন। কি করলাইন গো মা, কি করলাইন!"
কান্নায় ভেঙে পড়লো মোবারক আলী সাহেবের সাথের সেই মুসল্লি, যার মেয়েকে ভর্তি করাতে ঢাকা ভার্সিটিতে নিয়ে এসেছিলেন তিনি। মেয়েকে আগে থেকে জানাননি, হঠাৎ উপস্থিত হয়ে চমকে দিবেন বলে। সাথী লোকটার মেয়েকে ভর্তি করিয়ে কলাভবন থেকে বের হচ্ছিলেন তিনি। কাজ শেষ, মেয়েকে ফোন দেয়ার জন্য মোবাইল বের করতেই সামনে দৃশ্য দেখে যেন পাথর বনে গেলেন তিনি। নিজের চোখকে অবিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছে তার....
অদূরেই কিছু ছেলেমেয়ের জটলা। একসাথে আড্ডা আর হাসাহাসি চলছে। মোবারক সাহেব ডানপাশের একটি মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে তার। মেয়েটি সালোয়ার কামিজ পড়ে আছে। ওড়না গলায় ঝোলানো, কোমর সমান চুল বাতাসে উড়ছে। তার আদরের মেয়ে লিমা, যাকে নিয়ে এত গর্ব তাঁর। বাড়ি থেকে ঢাকা আসার সময় সে বোরকা পরেই আসে। বাড়িতে ফেরার সময়ও তাই। মোবারক সাহেব জানতেন তাঁর মেয়ে পর্দা মেনেই ভার্সিটিতে যায়। অথচ আজ কি দেখলেন তিনি!
কোনো কথা না বলে ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে এসে ময়মনসিংহ গামী একটা বাসে উঠলেন। সারাজীবনের বিশ্বাস, ভরসা ভেঙে যাওয়ার আঘাতটা আর নিতে পারলেন না। সবাইকে দাইয়্যুস না হতে উদ্বুদ্ধ করা তিনি আজ নিজেই দাইয়্যুস। চলন্ত গাড়িতে হার্ট এ্যাটাকে মারা গেলেন মোবারক আলী সাহেব, এক বেপর্দা মেয়ের বাবা, এক দাইয়্যুস!
(সমাপ্ত)

No comments